ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই নির্বাচনে বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণের পাশাপাশি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি, বিরোধী দলগুলো ৪৮টি এবং নেতানিয়াহুর প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে আগ্রহী আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ১৯টি আসন পেতে পারে। তবে অনুপস্থিত ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে এই হিসাব পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটির প্রধান বুধবার গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে চিঠি দিয়ে কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী কিছু বিদেশি পক্ষের অর্থায়নের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরিচয় বা অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
নেতানিয়াহু বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছেন। তাঁর দল লিকুদ পার্টিও নির্বাচনে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং ভোটগ্রহণ সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যায়িত করার কথা রয়েছে। এরপর ১০ নভেম্বর নতুন পার্লামেন্টের শপথ গ্রহণের নির্ধারিত সময় সামনে রেখে সরকার গঠনের আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিরোধী শিবিরের অন্যতম নেতা ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনী তদন্তের বিষয়টি ব্যবহার করে নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করার সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি।
সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও বিরোধীদের সমর্থন দিয়ে পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে আইন প্রণয়ন ও পার্লামেন্টের কার্যসূচি নির্ধারণেও তাদের ভূমিকা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরব দলগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্টের প্রধান আহমেদ তিবি আর্মি রেডিওকে জানিয়েছেন, নতুন স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে বিরোধী পক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। যৌথ দলটি ওই প্রার্থীর প্রতি সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তিবি আইজেনকোটকে রাজনৈতিক সাহস দেখানোর আহ্বানও জানিয়েছেন।
নির্বাচনের পর দেওয়া প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে আইজেনকোট এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের কথা বলেছেন, যা দেশের সব জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে। সরকার গঠনের জন্য আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও তিনি এখনই কোনো আনুষ্ঠানিক জোটের ঘোষণা দেননি।
এবারের নির্বাচনে আরব নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণকে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জয়েন্ট লিস্টের প্রতিনিধিদের দাবি, আরব ভোটারদের পাশাপাশি তাদের সমর্থনে ইহুদি ভোটারদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তেল আবিব ও জেরুজালেমের রক্ষণশীল এলাকাতেও আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সমর্থনে সমাবেশ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ আগামী সপ্তাহে সরকার গঠনের জন্য একজন রাজনৈতিক নেতাকে আহ্বান জানাবেন। সাধারণত সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেটি বাধ্যতামূলক নয়। একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আগামী বছরের শুরুতে আবারও নির্বাচন হতে পারে। তবে হারজোগ ও আইজেনকোট—দুজনই নতুন নির্বাচন এড়ানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন।
সরকার গঠনের জটিলতার পেছনে দেশটির দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনও ভূমিকা রাখছে। ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর বিরোধের পাশাপাশি অতি-গোঁড়া অর্থোডক্স ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নটি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। চলমান যুদ্ধে বহু পরিবারের সন্তানদের প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে।
দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে বিতর্কিত করে রেখেছে। গাজায় জিম্মিদের মুক্তির বিষয়টি রাজনৈতিক স্বার্থে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ এবং পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে দেশটি।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। নির্বাচনের ফল ও সরকার গঠনের আলোচনায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁদের অনেকে। নাজারেথের বাসিন্দা ব্রোসলি এলিয়াস আশা প্রকাশ করে বলেন, স্রষ্টার ইচ্ছায় তাঁরা এমন একটি সরকার দেখতে পাবেন, যা তাঁদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেবে।