রংপুর নগরের কামালকাছনায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য মানতে পারছেন না নিহতদের স্বজনেরা। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার দুই তরুণ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে পুলিশ জানালেও পরিবারের সদস্যরা ঘটনার আরও কিছু দিক সামনে এনে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এর আগে আটক হওয়া মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) পরে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
গত শনিবার রাতে কামালকাছনা এলাকার একটি নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই চারজনকে হত্যা করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পরে আদালতে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে দুই তরুণের বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজনেরা। গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কম বয়সী দুই ছেলে চারজন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। তাদের শারীরিক অবস্থাও এমন নয় যে তারা চারজনকে হত্যার ক্ষমতা রাখে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছে।’
স্বজনদের সন্দেহের আরেকটি কারণ ঘটনাস্থলের অবস্থা। বিশ্বজিৎ রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আলমারি ও ড্রয়ার খোলা এবং তছনছ অবস্থায় ছিল। বাড়িটির বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন পাওয়া যায়। এসব বিষয় আমলে নিয়ে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীও পুলিশের দেওয়া হত্যার কারণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে আমরা সন্দিহান। কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ বলছে, ইয়াবাসেবী দুজন নাকি একে একে চারজনকে হত্যা করেছে।’
গ্রেপ্তার দুই তরুণের পরিবারও তাদের বিরুদ্ধে ওঠা হত্যার অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছে না। সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস জানান, পুলিশ রাতে তাদের বাড়িতে গিয়ে সিদ্ধার্থকে ঘুম থেকে ডেকে আনতে বলে। তিনি নিজেই ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে পুলিশের সঙ্গে পাঠান।
কানু দাস বলেন, ‘আমি বিভিন্ন এলাকায় কীর্তন করে বেড়াই। আমার ছেলে সহজ-সরল। পুলিশ রাতে বাড়িতে এসে ঘুম থেকে তাকে ডেকে আনতে বলে। আমি তাকে ঘুম থেকে তুলে পুলিশের সঙ্গে পাঠাই। পরে তাকে ধরে নিয়ে যায়। শুনেছি, আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে সে কাউকে খুন করবে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাসও তার ছেলে নেশা করার কথা স্বীকার করেছেন। তবে হত্যার অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’
পুলিশ অবশ্য বলছে, হত্যাকাণ্ডে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এর আগে সাংবাদিকদের জানান, রোববার ভোরে অভিযানের সময় দুই তরুণের একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বুঝতে পেরে পালিয়ে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগানে লুকিয়ে ছিলেন। পরে তুঁতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং ঘটনাস্থলের আলামতের ভিত্তিতে পুলিশের ধারণা, চারজনকে হত্যার পর খুনিরা ওই ভবনেই বসে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে রোববার ভোরে আটক করা হয়। পরে তারা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’
একদিকে পুলিশের দাবি ও দুই তরুণের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তথ্য, অন্যদিকে ঘটনাস্থলের অবস্থা এবং দুই গ্রেপ্তার ব্যক্তির সক্ষমতা নিয়ে স্বজনদের প্রশ্ন—এই দুই দিক সামনে রেখে চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে বিস্তারিত তদন্ত চাইছে নিহত পরিবার।