ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের সূচনায় বড় ভূমিকা রেখেছিল প্রশ্নফাঁসবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রায় ৩০ বছর পর সেই একই ইস্যুকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে তাকে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে ওডিশায় তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের আমলে উচ্চমাধ্যমিক (প্লাস টু) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে ভুবনেশ্বরে রাজ্য সচিবালয়ের সামনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) আয়োজিত বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির তৎকালীন জাতীয় সম্পাদক ধর্মেন্দ্র প্রধান। ওই কর্মসূচিতে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন।
সে সময় উত্কল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে এবিভিপির জাতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকাকালেই প্রশ্নফাঁসবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের জুনিয়র এবং বর্তমানে আরএমডি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রশান্ত রাউত এনডিটিভিকে জানান, আন্দোলনের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার দাবি, ওই ঘটনায় ধর্মেন্দ্র প্রধান গুরুতর আহত হন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাড় ভেঙে যায়। তবুও তিনি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে ওডিশা সরকার। তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং কাউন্সিল অব হায়ার সেকেন্ডারি এডুকেশনের চেয়ারম্যান ও সচিবসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে রাজ্যজুড়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
তবে ২০২৬ সালে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিজেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে আন্দোলনের মুখোমুখি হন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
গত ৫ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা বিক্ষোভ শুরু হয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এক্সে প্রকাশ করা পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনার নৈতিক দায় শুরু থেকেই তিনি স্বীকার করেছেন। দেশের তরুণদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েই তিনি দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্দোলনকে যেন কোনো ‘দেশবিরোধী শক্তি’ কাজে লাগাতে না পারে, জাতীয় ঐক্য অক্ষুণ্ন থাকে, শিক্ষার্থীরা আইনি জটিলতায় না জড়ায় এবং স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন।
এর আগে নিট প্রশ্নফাঁসের তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সরকার পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিট-ইউজি পরীক্ষা কম্পিউটারভিত্তিক (সিবিটি) পদ্ধতিতে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আরও কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন একটি আইনের খসড়াও অনুমোদন পেয়েছে।
এদিকে, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনের প্রথম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করলেও জানান, তাদের কর্মসূচি এখানেই শেষ নয়।
সংগঠনটির বাকি দাবির মধ্যে রয়েছে—প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।