নিট (NEET) ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত এই আন্দোলনে হাজারো শিক্ষার্থী ও সমর্থক এখনো রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদে এটি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় জনঅসন্তোষের একটি হয়ে উঠেছে।
কেন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি?
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর মেডিকেল কলেজে ভর্তির এই জাতীয় পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
গত ৩ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। পরে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হতাশার কারণে অন্তত এক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। পরে জুন মাসে পুনরায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
নিট পরীক্ষা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ভারতে স্নাতক পর্যায়ের মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার একমাত্র জাতীয় পরীক্ষা হলো নিট। প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী এতে অংশ নিলেও আসন রয়েছে দেড় লাখেরও কম। ফলে এটি দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষাগুলোর একটি।
শিক্ষাবিদদের মতে, সীমিত আসনের কারণে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে হয়। এতে মানসিক চাপ, আর্থিক ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা অনেক বেড়ে যায়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস কি নতুন ঘটনা?
না। ভারতে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ আগেও বহুবার উঠেছে। ২০২৪ সালেও নিট পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছিল, যদিও তখন পুনঃপরীক্ষা নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া পুলিশ, শিক্ষকসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাও অতীতে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বিতর্কের মুখে পড়েছে।
কেন এবার আন্দোলন এত বড় হলো?
নিট বিতর্কের পরই গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে ব্যঙ্গধর্মী একটি শিক্ষার্থী আন্দোলন। মে মাসের মাঝামাঝি যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি অল্প সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, উচ্চ বেকারত্ব এবং তরুণদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ একসঙ্গে মিলে আন্দোলনটিকে বড় আকার দিয়েছে।
সরকারের অবস্থান
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ দূর করতে সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনবে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
আন্দোলনকারীদের অন্যান্য দাবি
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াও আন্দোলনকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
- আন্দোলনের সমর্থক সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি নিশ্চিত করা।
- পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।
বর্তমান পরিস্থিতি
সংসদ ভবন অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের সময় পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটলেও আন্দোলন থেমে যায়নি। হাজারো শিক্ষার্থী এখনো দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও বিষয়টি নিয়ে সরকারকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে চাপে রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে এমন এই ইস্যু আগামী দিনে মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।