ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ঢাকার মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের দেড় মাসের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালটিকে পুনরায় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে সরকার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
গত ২৭ মে, ঈদের আগের দিন সকালে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওয়ার্ডটিতে ১১ জন মা ও ছয় নবজাতক ভর্তি ছিলেন। রাতে কিছু সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু করলে কয়েকজন নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ছয়জনেরই মৃত্যু হয়। পরিবারের আবেদনের পর ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়। এরপর গত ৪ জুন হাসপাতালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেয়।
তৎকালীন সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ৪ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় অধিদপ্তর। কিন্তু নোটিসের যে জবাব ও ব্যাখ্যা আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষের দিয়েছে, তা সন্তোষজনক না হওয়ায় মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিনেন্স অনুযায়ী হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।”
পরে অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, ২৪ জুন লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল করে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও সামনে আসে। গত ১৩ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেন, “এই যে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে আমার পেছনে; আল্লাহর রহমতে আপনাদের দোয়ায় কোনো টাকার প্রতি লোভ হয় নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আপনি যা করবেন, আমি পূর্ণ সমর্থন দেব। আমি লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছি।”
তবে দুই দিন পর সংবাদ সম্মেলনে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি দাবি করে থাকেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল তার পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে, তাহলে সেই অভিযোগের প্রমাণ তাকেই দিতে হবে।”
এরপর গত ১৩ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন। পরিদর্শনে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়া গেলে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।”
সেদিন লাইসেন্স পুনর্বহালের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আরও বলেন, “ছয়টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে সমালোচনার মুখে পড়তে হত। তাই ঘটনার পরই সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আইসিইউসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত ত্রুটি দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং কর্তৃপক্ষ সেগুলো সংস্কারের কাজ করছে বলে জানিয়েছে।”
তিনি তখন আরও জানিয়েছিলেন, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনো হাসপাতালটিকে কোনো চূড়ান্ত ছাড় দেয়নি। পুনরায় পরিদর্শনের পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
সোমবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকার জানায়, হাসপাতালের আপিল নিষ্পত্তির জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদনে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়ায় লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করে শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালটিকে পুনরায় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।