লর্ডসে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিন ক্রিকেটের বাইরের এক রাজনৈতিক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে মাঠেও। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার স্কাই স্পোর্টস সম্প্রচার করলে মধ্যাহ্নভোজের পর পাকিস্তান দল মাঠে না ফেরার হুমকি দিয়েছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। তবে আলোচনার পর সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয় এবং নির্ধারিত সময়েই শুরু হয় বিকেলের খেলা।
স্পোর্টস ওয়েবসাইট ‘ইএসপিএন ক্রিকইনফো’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাসিম ও সুলাইমান খানের ১৮ মিনিটের আগে ধারণ করা সাক্ষাৎকারটি লাঞ্চ বিরতিতে দেখানোর কথা ছিল। পিসিবির আপত্তির মুখে স্কাই স্পোর্টস প্রথমে সম্প্রচার সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেয়। পরে দুই পক্ষের আলোচনার পর সেটি প্রচার করা হয়।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন। লর্ডসের প্যাভিলিয়নে ইমরান খানের একটি প্রতিকৃতির সামনে সেটি ধারণ করা হয়েছিল।
সাক্ষাৎকার প্রচারের সময় পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা ইতোমধ্যে বিকেলের সেশনের জন্য আউটফিল্ডে ওয়ার্ম-আপ করছিলেন। ফলে খেলা বন্ধের হুমকি বাস্তবায়িত হয়নি এবং কোনো বিলম্ব ছাড়াই ম্যাচ আবার শুরু হয়।
পিসিবির বর্তমান চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একই সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের কারাবাস ও পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা নিয়ে তার দুই ছেলে গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে সংসারে জন্ম নেওয়া কাসিম ও সুলাইমান অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সরকার তাদের বাবাকে কারাগারে ‘হত্যার চেষ্টা করছে’। তাদের দাবি, ইমরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে এবং তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
কাসিম ও সুলাইমান ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তাদের বাবাকে দেখেননি। সর্বশেষ গত মার্চে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে বলে জানান তারা। সুলাইমানের দাবি, ইমরান এক চোখের ৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তাকে দিনে ২৩ ঘণ্টা অত্যন্ত ছোট একটি সেলে রাখা হয়, নতুন বই দেওয়া হয় না এবং গ্রীষ্মে সেখানে এসি বা ফ্যানের ব্যবস্থাও নেই। নির্জন কারাবাসের মানসিক চাপে তার রক্তচাপ বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কাসিম বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি মেনে কাজ করছে না। তারা অত্যন্ত নগ্নভাবে তাকে কারাগারেই মেরে ফেলার চেষ্টা করছে, যাতে তাকে দীর্ঘ সময় বন্দি রেখে চুপ করিয়ে রাখা যায়।’
বাবার সঙ্গে তার বোনদের সর্বশেষ কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে কাসিম আরও বলেন, ‘সবশেষ যখন তিনি আমাদের ফুফুদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন, তখন জানিয়েছিলেন যে সম্প্রতি তার ওপর অত্যাচারের মাত্রা অনেক বেড়েছে। তিনি এটিকে অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের উদাহরণ দিয়ে তুলনা করেছেন যারা কারাগারে মারা গেছেন বা যাদের মেরে ফেলা হয়েছে।’
কাসিমের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠিন পরিস্থিতিতেও ইমরান সাধারণত শান্ত ও স্থির থাকতেন—এমনকি তার দিকে সরাসরি বন্দুক তাক করার সময়ও। কিন্তু কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি তাকে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরানকে ইসলামাবাদের শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর এবং ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সুলাইমান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা সত্যি করে বেসরকারি সেই হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে সরকার তাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায় এবং নামমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে তড়িঘড়ি করে পুনরায় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।’
দুই ভাইয়ের অভিযোগ, বাবার সঙ্গে দেখা করতে পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করেও তারা সফল হননি। কারিগরি জটিলতার কথা বলে তাদের ভিসা আটকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কাসিম ও সুলাইমান। সুলাইমান বলেন, ‘আমরা যখনই ফরেন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তারা কেবল মৌখিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছে কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’
কাসিম বলেন, ‘আগের রক্ষণশীল সরকারের আমলে আমরা শূন্য সমর্থন পেয়েছি। তারা আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে আমাদের পাকিস্তানে যাওয়া উচিত হবে না এবং গেলে তারা কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না। আমরা আশা করি নতুন লেবার সরকারের নতুন পররাষ্ট্র সচিবের আমলে আমরা আমাদের বাবাকে দেখার সুযোগ পাব।’
স্কাই স্পোর্টস সাক্ষাৎকারের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও প্রচার করেছে। ইসলামাবাদের দাবি, ইমরানকে একজন ‘দণ্ডিত কয়েদি’ হিসেবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধীনেই রাখা হয়েছে। তাকে সাতটি সেলের একটি বিশেষ কম্পাউন্ড দেওয়া হয়েছে, যেখানে শরীরচর্চার সুবিধা রয়েছে। তিনি ঘরে রান্না করা খাবার, বই ও টেলিভিশনের সুবিধাও পাচ্ছেন। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ৯০০ জনের বেশি দর্শনার্থী ইমরানের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং চিকিৎসকেরা তাকে সম্পূর্ণ ফিট ঘোষণার পরই কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ উন্নয়ন কার্যালয়ও এ বিষয়ে অবস্থান জানিয়েছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যাতে যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করে না। তবে ব্রিটিশ মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ইমরান খানের সুরক্ষাসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাগুলো বজায় রাখার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন।’
৭৩ বছর বয়সী ইমরান পাকিস্তানের হয়ে ৮৮টি টেস্ট খেলেছেন। তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় আসার পর ২০১৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত তিন বছর ধরে একাধিক মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন তিনি। বিশ্বজুড়ে ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক এবং যুক্তরাজ্যে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মানবিক চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন।
লর্ডসের ঘটনা পাকিস্তান ক্রিকেটের ২০ বছর আগের আরেক বিতর্কিত টেস্টের স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে। ২০০৬ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ টেস্টে আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার ও বিলি ডকট্রোভ বল বিকৃতির অভিযোগে পাকিস্তানকে পাঁচ রান জরিমানা করে বল পরিবর্তন করেছিলেন। প্রতিবাদে অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দল চা-বিরতির পর মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে আম্পায়াররা ম্যাচটি বাজেয়াপ্ত করে ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করেছিলেন।