যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ১৫ জন নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বন্যায় গিরিখাতের ভেতরের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পানি সরবরাহকারী একমাত্র পাইপলাইনটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যায় কলোরাডো নদীর ক্রিস্টাল র্যাপিডস এলাকার কাছে ৪৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিচয় বা মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের একজন ময়নাতদন্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন।
বন্যার মূল আঘাত আসে শনিবার ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিকে। উত্তর প্রান্ত থেকে নেমে আসা এই জলধারা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কলোরাডো নদীতে মিশেছে। আকস্মিক বন্যার পর গিরিখাতের গভীর এলাকা থেকে ৬০ জনের বেশি মানুষকে হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়। রোববার আরও মানুষকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করে অ্যারিজোনা জননিরাপত্তা বিভাগ।
এখনও যেসব পর্যটক বা ক্যাম্পে অবস্থানকারী ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁদের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে তা জানাতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস।
বন্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত ক্ষতির একটি হয়েছে পার্কের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ পর্যটক এবং গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভিলেজের প্রায় ১ হাজার ৬০০ বাসিন্দার পানির চাহিদা মেটানো পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিরাপদ পানির সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার থেকে পার্কের ভেতরের লজ ও হোটেলগুলোতে পর্যটকদের রাতযাপন করতে দেওয়া হবে না। সারা বছর সেখানে বসবাসকারী বাসিন্দাদেরও পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বলা হয়েছে।
পার্ক কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘পানির সম্পদের নিরাপত্তা ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পানির সংকটের কারণে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে পর্যটকদের রাতযাপন বন্ধ করার ঘটনা বিরল। দক্ষিণ প্রান্তে নিরাপদ পানির বড় সংরক্ষণ ট্যাংক থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত সেখানে নতুন করে পানি ভরা সম্ভব হবে না।
পাইপলাইনটির সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে ২০ কোটি ৮ লাখ ডলারের একটি প্রকল্প ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটি আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এবারের বন্যা সেই দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
ইউটা স্টেট ইউনিভার্সিটির কলোরাডো নদী গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক জ্যাক শ্মিট বলেন, ‘নিচের পুরো ব্যবস্থাটিই যদি নতুন করে নির্মাণ করতে হয়, তাহলে ঈশ্বরই আমাদের ভরসা। এর জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে জানা নেই?’
বন্যার সময় ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যানিয়নে অবস্থান করা কয়েকজন পর্যটক পরিস্থিতির ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছেন। শনিবার পার্থ দেশাই কয়েকজন সহকর্মী চিকিৎসক এবং পার্কের একজন কর্মীর সঙ্গে সরু একটি পথ দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ ভারী বৃষ্টি শুরু হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম খালের পানি উপচে পড়ছে, হঠাৎ করে বিভিন্ন জায়গা থেকে জলপ্রপাতের মতো পানি নেমে আসছে, বড় বড় পাথর গড়িয়ে আসছে, চারদিকে কাদা ও ভূমিধস হচ্ছে।’
ফ্যান্টম র্যাঞ্চের দিকে যাওয়ার সময় তাঁদের একজন সহকর্মী হঠাৎ চিৎকার করে বলেন, ‘ওপরে, ওপরে, ওপরে, ওপরে!’ প্রায় চার ফুট বা এক মিটার উঁচু ধ্বংসাবশেষের স্রোত তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছিল। দেশাই জানান, তাঁরা দৌড়ে গিয়ে ক্যাকটাসের মধ্যে একটি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেন। পরে শনিবার গভীর রাতে হেলিকপ্টারে তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
বন্যার স্রোতে খালের ওপর থাকা পায়ে হাঁটার সেতুগুলো ভেসে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ভূমিধস এবং বড় পাথর নেমে আসায় এলাকার ভূপ্রকৃতিও বদলে গেছে। খালের তলদেশ প্রশস্ত হয়েছে এবং আগে থাকা একটি খরস্রোতা অংশ আরও বিস্তৃত হয়েছে অথবা নতুন একটি খরস্রোতা অংশ তৈরি হয়েছে।
ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যাম্পগ্রাউন্ডে অবস্থান করা এরিকা ভিওলা জানান, তিনি ও আরও প্রায় ৫০ জন পর্যটক শনিবার খালের পানি বাড়তে এবং ধ্বংসাবশেষ ভেসে যেতে দেখেছেন। ভেসে যাওয়া জিনিসের মধ্যে একটি ভবনের শয়নকক্ষের মতো কিছু ছিল বলেও জানান তিনি। হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়ায় তাঁর ভ্রমণ পরিকল্পনা নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই শেষ হয়ে যায়।
ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যাম্পগ্রাউন্ড, নর্থ কাইবাব ট্রেইল এবং ফ্যান্টম র্যাঞ্চ রোববারও বন্ধ ছিল। তবে পার্কের দক্ষিণ প্রান্তের প্রবেশপথের বাইরে তুসায়ান এলাকায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের ফ্ল্যাগস্টাফ কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ ড্যারেন ম্যাককলাম জানান, খাড়া ও পাথুরে ওই এলাকায় প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি, অর্থাৎ প্রায় ১ থেকে ২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই দুটি ছোট বৃষ্টিবাহী মেঘমালা এলাকাটিকে ভিজিয়ে দিয়েছিল।
ম্যাককলাম বলেন, ‘তাই মূল ঝড়টি যখন সেখানে প্রবেশ করে, তখন আগে থেকেই ভেজা সবকিছুর ওপর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। আর এ কারণেই আমরা এখন যেসব সমস্যা দেখছি, সেগুলোর সৃষ্টি হয়েছে।’
ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিক উত্তর প্রান্ত থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ভেতর দিয়ে প্রায় ৬ হাজার ফুট বা ১ হাজার ৮২৮ মিটার নিচে নেমে কলোরাডো নদীতে মিলেছে। এই খাড়া ভূপ্রকৃতি এবং গ্রীষ্মকালীন বর্ষা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, সোমবার পর্যন্ত ওই এলাকায় আরও বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।