জাতীয় সংসদে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধ দ্রুত রাজপথের কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়াকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। বিশেষ করে লংমার্চের মতো কর্মসূচিকে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে গণআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউট (বিলিয়া) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অবস্থান তুলে ধরেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সংসদীয় রাজনীতিতে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সংসদের বিতর্ককে দ্রুত রাজপথে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে।’
বিরোধীদলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখতে সরকারি দলকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা তাদের দায়িত্ব। তবে সংসদীয় বিতর্ককে অপ্রয়োজনে দ্রুত রাজপথে নিয়ে যাওয়া নিয়ে দেশের সচেতন মহলের সতর্ক থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষায়, ‘রাজনৈতিক দলগুলো কতটা বুঝে এসব করছে তা জানি না, তবে এই ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি নানান অপশক্তি ওঁৎ পেতে বসে থাকে।’
সংসদে সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘কেবলমাত্র সরকারি দলকে ফাঁদে ফেলার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংসদীয় রাজনীতি ধরে রাখা যায় না।’ বিভিন্ন ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ এলে তা দেশ পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারের অর্থনৈতিক ও নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েও কথা বলেন জহির উদ্দিন স্বপন। তার দাবি, বিগত দুই দশকের ফ্যাসিবাদের চর্চা, ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থা ও দুর্বল অর্থনীতির অবস্থা থেকে দেশকে বের করে একটি নতুন গতিমুখ নির্ধারণে সরকার সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, সংকটের গভীরতা বিবেচনায় রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান চাপের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতা ও অতীতের ভুল নীতিকে দায়ী করেন তিনি। প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে স্থায়ী উদ্যোগ না নেওয়ার সমালোচনা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘এতদিন ক্ষমতায় থেকেও প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে স্থায়ী পদক্ষেপ না নেওয়া কেবল দুর্নীতিই ছিল না, এটি ছিল জাতির সঙ্গে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণা।’
বর্তমান সরকার বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা এবং নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে চীন ও ভারতের পাশাপাশি পণ্য আমদানির নতুন উৎস তৈরির চেষ্টা চলছে বলে জানান জহির উদ্দিন স্বপন। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় কমানো এবং রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গোলটেবিল বৈঠকের নাগরিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের আলোচনা ও গবেষণা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহিতার চর্চাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের পর্যালোচনা: সুশাসন, জবাবদিহিতা ও উন্নয়নের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গোলটেবিলটি যৌথভাবে আয়োজন করে ‘সিটিজেন ফোরাম বাংলাদেশ’ এবং ‘বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ইনিশিয়েটিভস’ (বিসিএআই)।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা সঞ্চালনা করেন ডাক্তার সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত। আলোচনায় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা বক্তব্য দেন।