খুলনা অঞ্চলে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারসহ সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ৩০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান, ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান এবং পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুককে এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে অনুষ্ঠিত ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় খুলনার পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ওই তিন কর্মকর্তার কাছে তাদের এলাকার বর্তমান পরিস্থিতির কারণ এবং তা মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চান।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার পুলিশ কমিশনার ও ডিআইজির দেওয়া ব্যাখ্যায় নীতিনির্ধারকেরা সন্তুষ্ট হননি। এরপর ৩০ দিনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত ও দৃশ্যমান উন্নতি আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
সভায় খুলনা অঞ্চলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন জেলা ও ইউনিট পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুলনার পুলিশের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত এবং টহল বাড়ানোর কথাও তুলে ধরেন। তবে সরকার দ্রুত আরও শক্ত মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপ দেখতে চায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
খুলনা মহানগরে হত্যাকাণ্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সমকালের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত মহানগর এলাকায় ৯৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খুন হয়েছে ২৯টি।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই মাসে খুলনা মহানগরে খুনের মামলা হয়েছে ৩টি। একই সময়ে চট্টগ্রাম মহানগরে ৪টি, রাজশাহীতে ১টি, সিলেটে ৫টি এবং গাজীপুরে ৭টি খুনের মামলা হয়। জুলাইয়ে ঢাকা রেঞ্জে সর্বোচ্চ ৬৬টি খুন হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জে হয়েছে ৫৪টি এবং খুলনা রেঞ্জে ২৯টি। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত খুলনা রেঞ্জে খুনের সংখ্যা ৮৫। একই তিন মাসে খুলনা মহানগরে ৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
রাজারবাগের সভায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশের অপরাধ পরিস্থিতির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির। অতিরিক্ত আইজি, সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সুপাররা এতে উপস্থিত ছিলেন।
পর্যালোচনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এপ্রিল-জুন সময়ে এ ধরনের মামলা বেড়েছে দুই হাজার ২৬১টি।
পুলিশের হিসাবে, জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে দুই হাজার ২০০টি, মে মাসে এক হাজার ৯৫২টি এবং এপ্রিলে দুই হাজার ১১টি। তিন মাসে মোট মামলা ছয় হাজার ১৬৩টি। অন্যদিকে জানুয়ারিতে এ ধরনের মামলা ছিল এক হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১টি এবং মার্চে এক হাজার ৪৮৫টি। বছরের প্রথম তিন মাসে মোট মামলা ছিল তিন হাজার ৯৪৭টি।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার যথাযথ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য সভা থেকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি একজন চিকিৎসককে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও দৃশ্যমান উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়। পুলিশকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে না। এ অবস্থায় জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি কেন হবে না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়। পুলিশের জনবল বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও আলোচনায় আসে। মাদকবিরোধী সমাবেশ ও শোভাযাত্রা উপলক্ষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া গেলে রাতে পুলিশ লাইন্সে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা পুলিশ। উচ্চ স্বরে গানবাজনার অভিযোগ তুলে মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বলেন। এ নিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাদের তর্ক হয়। পরে তারা পুলিশ লাইন্সে ঢুকে অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ার ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা করে।
সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সফর ঘিরে পুলিশ লাইন্সে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনকে ‘ব্রিটিশ আমলের সংস্কৃতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রটোকলভিত্তিক আয়োজন কমানোর পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, কোনো ডিআইজি জেলায় গেলে এসপির বাসায় ‘ডিনার’ করতে পারেন। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডিআইজি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ত্যাগ করার পর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে বলেও সভায় জানানো হয়।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অপপ্রচার ও গুজব সম্পর্কে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে জোর দেওয়ার পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যেকোনো তৎপরতার তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট গঠনের বিষয়টিও সভায় উঠে আসে। মাদকের বিরুদ্ধে আরও জোরালো ভূমিকা নেওয়া, উগ্রবাদ যেন মাথাচাড়া দিতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং পুলিশের যানবাহনসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতির প্রসঙ্গও সভায় তোলা হয়। একজন পুলিশ সুপার এ বিষয়টি উত্থাপন করলে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির কথা জানানো হয়। সভায় উল্লেখ করা হয়, ২০ বছরের বেশি চাকরি করার পরও অনেকে এসপি পদে রয়েছেন, যেখানে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা কয়েক ধাপে পদোন্নতি পেয়েছেন। সুপারনিউমারারি পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদোন্নতির বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, আইজিপি আলী হোসেন ফকির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ দমনে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সব ধরনের অপপ্রচার ও গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটার আগেই সে সম্পর্কে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “পুলিশ দেশের জন্য, জনগণের কল্যাণে কাজ করছে।” সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বানও জানান তিনি।
সভায় গত তিন মাসের ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, পুলিশ আক্রান্ত ও অপহরণ মামলা, মুলতবি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত ও বিচারের ফলাফল এবং সাজার হার পর্যালোচনা করা হয়। ডাকাতি ও ধর্ষণ মামলার তদন্ত বাড়ানো, পুলিশ আক্রান্ত মামলার তদারকি জোরদার, মুলতবি মামলা কমানো এবং সাজার হার বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিখোঁজের ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।