চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত, গ্রেপ্তারের পর তার অপরাধজগতের বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে নানা তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অন্যতম প্রভাবশালী সন্ত্রাসীতে পরিণত হন এবং বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন।
পুলিশের তথ্যমতে, আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা। কৃষক পরিবারের সন্তান ইমন একসময় সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার ছিলেন। এসএসসি পাসের পর তিনি ওমানে যান এবং প্রায় এক বছর পর দেশে ফেরেন। পরে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোপুরি অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের সহযোগী ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম চক্রটির কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। চট্টগ্রর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা ও চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা এবং জেলার রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে তাদের তৎপরতা ছিল বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ বলছে, অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ ইমনের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন শুটার ও সক্রিয় অপরাধীর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার অস্ত্র হাতে তোলা একাধিক ছবি ও কলরেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তকারীদের দাবি, তার কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় তার নাম আসে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা এবং চন্দনপুরায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চাঁদার দাবিতে হামলার মামলাতেও তিনি অভিযুক্ত।
তদন্তে উঠে এসেছে, গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের চকবাজারে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদা না পেয়ে তার নির্দেশে ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওই ঘটনার অডিও ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে চাঁদার উদ্দেশ্যে একাধিক হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনার পেছনেও তার নির্দেশ ছিল বলে পুলিশের দাবি।
ডেভিড ইমনের অতীত সম্পর্কে তার সাবেক কোচ আমিনুল হক বলেন, “ইমন খুবই ভালো ক্রিকেট খেলতেন। বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান) হিসেবে তার ভালো পরিচিতি ছিল। ব্যাটিংও ভালো করতেন। জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের খেলোয়াড়েরা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে ইমন বল করতেন। তার ভালো সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই খেলা থেকে উধাও হয়ে যায়। ২০২০ সালের পর তাকে আর দেখা যায়নি।”
পুলিশ জানায়, ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক থেকে ইমনের দুই সহযোগী আসিফ ও আরিফকে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়।
এরপর ২৯ জুলাই ভোরে যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর চেকপোস্টে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে ভারতে পালানোর সময় ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি গোঁফ কেটে ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন এবং ‘মিরাজ’ নাম ব্যবহার করছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ডেভিড ইমন বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তিনি বলেন, “লোকজনকে ফোনে ইমন এমনভাবে হুমকি দিতেন, শুনলেই মানুষ খুব সহজে ভয় পেয়ে যেতো। অস্ত্রও ভালো চালাতে পারেন। ভয়ংকর শুটার। একাধিক হত্যাকাণ্ড, অপরাধ এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”