পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত গণহত্যা, গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগগুলোর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের গ্রেপ্তারের আবেদনও করা হয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে অভিযোগ দুটি জমা দেয় ‘বাংলাদেশ আজাদ পার্টি’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার ফোরাম’। সংগঠন দুটির পক্ষে অভিযোগ দাখিল করেন বাংলাদেশ আজাদ পার্টির প্রধান সংগঠক বোরহান মাহমুদ এবং রাষ্ট্র সংস্কার ফোরামের সদস্য সচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সময়গুলোতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ের ভিত্তিতে দুই সাবেক রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া যেকোনো অভিযোগ প্রথমে গ্রহণ করে নিবন্ধন করা হয়। এরপর সেটি তদন্ত সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। তদন্ত সংস্থা অভিযোগে তদন্তের উপাদান পেলে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা রেজিস্ট্রিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ জমা পড়লেই কাউকে অভিযুক্ত বা আসামি বলা যায় না। তদন্ত শুরু হওয়ার পরই আইনগতভাবে সেই অবস্থান নির্ধারিত হয়। তবে এই অভিযোগগুলো তদন্ত সংস্থার কাছে পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ আজাদ পার্টির নেতারা। সংগঠনটির প্রধান সংগঠক বোরহান মাহমুদ দাবি করেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং কথিত ‘আয়নাঘর’-সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর সময় আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে তারা এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
বাংলাদেশ আজাদ পার্টির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাদের হাতে সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও তারা তা প্রয়োগ করেননি। তিনি আরও দাবি করেন, অন্তত পদত্যাগের মাধ্যমে তারা অবস্থান স্পষ্ট করতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি।
অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কার ফোরাম জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকার তদন্ত চেয়ে পৃথক আবেদন করেছে।
সংগঠনটির সদস্য সচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস বলেন, তাদের অভিযোগে মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের আবেদনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রসিকিউশন প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে বলে তারা আশা করছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি। পাশাপাশি ২০২৪ সালের নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করে বিচার করার দাবি জানান তিনি।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবদুল হামিদ এবং টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তার উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই গত শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন।