নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণ, ঘটনার ভিডিও ধারণ করে ভয় দেখানো এবং পরে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ওই ছাত্রীর বাবার করা মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাতে কেন্দুয়া থানায় মামলাটি করেন ছাত্রীর বাবা। প্রধান আসামি ৫৫ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অভিযোগ সামনে আসার পর তাকে দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ এখনো রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে মামলার দুই নম্বর আসামি আবু মিয়াকে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালে, যখন মেয়েটি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ওই বছরের ২০ নভেম্বর স্কুল থেকে ফেরার পথে রফিকুল তাকে একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে ধর্ষণ এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ।
পরবর্তী সময়ে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। একপর্যায়ে রফিকুলের সহযোগিতায় অন্যরাও তাকে ধর্ষণ করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে মেয়েটিকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি কাউকে জানালে তাকে হত্যা করে পানির ট্যাংকে ফেলে দেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই রফিকুল একটি বাসায় নিয়ে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন।
এর কয়েক দিন পর, ১ আগস্ট মেয়েটি চট্টগ্রামে তার বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে যায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে থাকার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে মেয়েটি তার ভাবির কাছে ঘটনাগুলো জানায়।
পরে ১৮ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চট্টগ্রামের একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে আলট্রাসনোগ্রাম করার পর চিকিৎসকেরা জানান, মেয়েটি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরপর সে কেন্দুয়ায় বাড়িতে ফিরে এলে পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
মামলায় রফিকুল ইসলাম ও আবু মিয়া ছাড়াও ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে তিন নারীকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন রয়েছে এজাহারে।
এদিকে অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে কেন্দুয়া পৌর বিএনপি। বুধবার রাতে পৌর বিএনপির সভাপতি খোকন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাকে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি জানার পর দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রফিকুল ইসলামকে দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে ওই ছাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে বলেও জানান তিনি।