বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর চিপসহ উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর ও কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগের জন্য চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিতে এখন প্রচলিত উৎপাদন খাতের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সোমবার (২৭ জুলাই) চট্টগ্রামের আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রস্তাবিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় এক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আমরা শুধু বিনিয়োগ চাই না; প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে এই বিনিয়োগই হবে প্রধান চালিকাশক্তি।'
তিনি আরও বলেন, এই শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবলের চাহিদা তৈরি হবে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আজকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, সরকার ডিরেগুলেশন বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার নীতি অনুসরণ করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করতে খুব শিগগিরই 'সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস' চালু করা হবে, যার পরিকল্পনা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে তিনি জানান, মূলধন ও অর্জিত মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও আরও সহজ করা হচ্ছে। অতীতে এটি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলেও এখন বিনিয়োগকারীরা সহজেই তাদের অর্থ স্থানান্তর করতে পারবেন।
চীনা বিনিয়োগকারীদের দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এতে প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে এবং দেশের সাধারণ মানুষও এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতাও কমবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, '১৯৭৫ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের পর এখন চীন আমাদের কৌশলগত অংশীদারে পরিণত হয়েছে। শিল্প উৎপাদন ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই অংশীদারত্ব আরও গভীর হবে।'
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অঙ্গীকারে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বর্তমান সরকারের মাত্র ৫ মাসের মধ্যে উদ্বোধন করা সম্ভব হয়েছে। এটি আনোয়ারাসহ পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে এবং একটি আধুনিক স্মার্ট অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।'
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রকল্পটিকে দুই দেশের সহযোগিতার 'ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প' হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১১০টির বেশি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং ৩০টির বেশি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তাঁর মতে, এই শিল্পাঞ্চলে বৈদ্যুতিক যান (ইভি), ব্যাটারি ও চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্যমতে, ২০১৪ সালে প্রকল্পটির সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নিয়োগ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন অগ্রগতি পায়নি। পরে ২০২২ সালে চীনা সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-কে নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে। এরপর বেজা ও সিআরবিসি যৌথভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে, যেখানে বেজার মালিকানা ৩০ শতাংশ এবং সিআরবিসির ৭০ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে।
গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীন সরকার Preferential Buyer's Credit (PBC)-এর মাধ্যমে ঋণ দেবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। এটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
প্রকল্পের সহায়ক অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট-টন সক্ষমতার বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর। ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিআরবিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চ্যাংগুই, বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানির চেয়ারম্যান ওয়াং বেনকিয়ান, চিটাগং চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক এবং চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম।