স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় সফল ও মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে এলডিসি গ্রুপ। একই সঙ্গে সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়ন, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, জলবায়ু অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সোমবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সেখানে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় বৈশ্বিক সহায়তা ছাড়া ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং দোহা কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
বক্তব্যে তিনি ২০৩০ এজেন্ডা এবং দোহা কর্মসূচির প্রতি এলডিসি গ্রুপের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এই দুটি বৈশ্বিক কাঠামো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
ড. তিতুমীর বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই লক্ষ্য অর্জনের গতি কমে যাচ্ছে। এলডিসিগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, ঋণের বাড়তি চাপ, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) হ্রাস, ডিজিটাল বৈষম্য এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নের সীমিত সুযোগ উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তার মতে, এসব চ্যালেঞ্জ শুধু এসডিজি বাস্তবায়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে না, বরং দোহা কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য—২০৩১ সালের মধ্যে আরও বেশি এলডিসিকে টেকসইভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণ—সেটিও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ১৪টি স্বল্পোন্নত দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এই দেশগুলোর জন্য ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখা জরুরি। নজিরবিহীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল তাদের উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ড. তিতুমীর বলেন, এই অতিরিক্ত সময় কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দোহা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এলডিসিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ, বহুমুখী অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
আগামী বছর কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিতব্য দোহা কর্মসূচির মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনাকে তিনি বৈশ্বিক অংশীদারত্ব পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ উপলক্ষে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি, যাতে পর্যালোচনা প্রক্রিয়া বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ হয়।
এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে তিনি পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে সহজ শর্তে ও পূর্বানুমেয় উন্নয়ন অর্থায়ন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, সহজপ্রাপ্য ও ঝুঁকিভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা, এলডিসিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করা।
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সহনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ সংকট মোকাবিলায় টেকসই সমাধান এবং ন্যায্য বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোজন, জলবায়ু সহনশীলতা, জ্বালানি রূপান্তর এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের জন্য পর্যাপ্ত ও দ্রুত প্রাপ্তিযোগ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে ড. তিতুমীর বলেন, এলডিসিগুলোর বর্তমান চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সংহতি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বড় পরীক্ষা। তার মতে, দোহা কর্মসূচির মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনাকে এমন একটি মোড় পরিবর্তনের সুযোগে পরিণত করতে হবে, যা টেকসই উন্নয়নের গতি ফিরিয়ে আনবে, বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠন করবে এবং কাউকে পেছনে না রেখে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন গতি সৃষ্টি করবে।
তিনি জানান, এই লক্ষ্য অর্জনে এলডিসি গ্রুপ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।