জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতির পর টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। এ সফরে জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। পরে তাঁকে নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে সেখানেই তাঁর অবস্থানের কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। জ্যাকসন হাইটসে ব্যানার, ফেস্টুন, মিছিল ও স্লোগানের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানান নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকেও দলীয় কর্মীরা নিউইয়র্কে জড়ো হন।
জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তাঁর ভাষণ প্রায় ১৫ মিনিটের হতে পারে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুরু হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’।
তিন দিনে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। এদিন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন তিনি। পরে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে তাঁর।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের আয়োজনে একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে টেকসই সমাধানের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান। মাতৃ ও নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রোধ এবং দক্ষ মিডওয়াইফারি সেবা নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও বক্তব্য রাখবেন তিনি।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি
সফরের ফাঁকে কুয়েত, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গেও সাক্ষাতের কথা রয়েছে তাঁর।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে মেটা, ওয়াল স্ট্রিট এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অগ্রাধিকার বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে সফরটিকে দেখা হচ্ছে।
২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমিরেটসের ফ্লাইটে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর দেশে ফেরার কথা।