দীর্ঘ ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে ৩৪৯ জন ভোটারের অংশগ্রহণে ভোট হবে। দুপুর ২টায় শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও ভোটগ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইন অনুযায়ী তিনি এই নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. অলি আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
সিইসি জানান, দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি ছিল। সে কারণে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় মহড়া ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালটের গোপনীয়তার পরিবর্তে স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যালটে ভোটার ও প্রার্থীর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ফলে কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তা উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে দৃশ্যমান থাকবে। ভোট ও গণনার সময় সংসদ সদস্যরাও কক্ষে উপস্থিত থাকতে পারবেন।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিকেল ৫টা থেকেই গণনা শুরু হবে। গণনা শেষে নির্বাচনী কর্তা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করবেন সিইসি। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা ভোটার হিসেবে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ফল গণনার পর্ব বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মোট ভোটার ৩৪৯ জন। সিইসি জানিয়েছেন, সংসদীয় আসনের ক্রমিক পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানে ৩০০ আসন শেষ হলেও ভোটগ্রহণ পরিচালিত হবে সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা শূন্যতার কারণে তালিকার বিভক্তি নম্বরে কিছুটা ধারাবাহিকতার ব্যতিক্রম থাকলেও সেটি নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবারের নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। ওই দিনই এ বিষয়ে ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করেছেন। এ জন্য ন্যূনতম সাত দিনের সময় রেখে গত ১১ আগস্ট গেজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. অলি আহমদের পক্ষে দুটি এবং বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে একটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।
১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহায়তায় মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সময়কার মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের একটি অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হওয়ায় চূড়ান্ত প্রার্থী থাকেন দুজন। ১৮ আগস্ট প্রত্যাহারের শেষ দিনেও তাঁদের কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।
নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানান সিইসি। সেই বিধান অনুসরণ করেই নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সূচি নির্ধারণ করেছে।
ভোটের দিন সংসদ ভবনের ভেতরে পরিবেশ ও বিধিবিধান বজায় রাখার দায়িত্ব থাকবে স্পিকারের। সংসদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এ ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। তবে ভোট চলাকালে হাউজের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে—এমন তথ্যও নাকচ করেন সিইসি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদের বৈঠক আহ্বান এবং ব্যালট ও প্রয়োজনীয় স্টেশনারি ছাড়া নির্বাচন কমিশনের বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় বা আলাদা বাজেট নেই।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর এই নির্বাচনের দিকে রয়েছে উল্লেখ করে সিইসি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।