প্রকাশ : ... | ... | ...

ইন্তেকালের পাঁচ বছর: আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর জীবন ও নেতৃত্ব


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: এ আই জেনারেটেড

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক আমীর ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘ শিক্ষকতা, ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব—এই তিন ক্ষেত্র তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। জুনাইদ বাবুনগরী দীর্ঘ সময় মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। বাবুনগর মাদরাসার পাশাপাশি হাটহাজারী মাদরাসায় মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেছেন বহু শিক্ষার্থী, যাঁরা পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্বীনি শিক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় ইস্যুতে সংগঠিত আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন বাবুনগরী। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, শিক্ষানীতি, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণ এবং ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁকে নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা যায়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে যুক্ত হন তিনি। সংগঠনটির বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর ২০২০ সালে বাবুনগরী হেফাজতে ইসলামের আমীর নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক জীবনের আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ ও ১৩ দফা দাবিতে ওই বছর সংগঠনটি আন্দোলন শুরু করে। ৫ মে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হেফাজতের নেতাকর্মী, মাদরাসার শিক্ষার্থী ও সমর্থকেরা ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হন। রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে অভিযান চালায়। পরদিন ৬ মে রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ মে আদালত তাঁকে নয় দিনের রিমান্ডে পাঠান। পরে আরও কয়েকটি মামলায় তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। বন্দি অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে মুক্তি পান। মুক্তির পর বাবুনগরী আবার হাদিসের পাঠদান এবং হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রমে সক্রিয় হন। পরবর্তী বছরগুলোতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য ও কর্মসূচিতে অংশ নেন। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ ঘিরে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির পর সংগঠনটির বহু নেতা-কর্মী ও আলেম গ্রেপ্তার হন। হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ওই সময় হেফাজতের আমীর হিসেবে বাবুনগরী গ্রেপ্তার হওয়া আলেমদের মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। এর মধ্যেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট হাটহাজারীতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে তিনি মারা যান। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁর অনুসারী, শিক্ষার্থী, আলেম ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা হাটহাজারীতে যান। জানাজা শেষে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। শিক্ষকতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও বাবুনগরীর সম্পৃক্ততা ছিল। ২০১৪ সালে ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠার সময় তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “ইনসাফ ইসলামী মিডিয়া জগতে একটি বিপ্লবের নাম। একটি ইনকিলাবের নাম।” জুনাইদ বাবুনগরীর দীর্ঘ কর্মজীবনে মাদরাসায় হাদিসের শিক্ষকতা, হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব, বিভিন্ন ধর্মীয় দাবিতে আন্দোলন এবং কারাবরণের মতো ঘটনা রয়েছে। মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও তাঁর জীবন বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা ও হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে আছে।