| ছবি: আলহেরা ২৪ অনলাইন
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং দুই সন্তান আগামী ও প্রিয়ম চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যাকারী বলে দাবি করেছে মহানগর পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবনের সময় গণপতির কাছে ধরা পড়ার পর নিজেদের ‘মান-সম্মান’ রক্ষার জন্য প্রথমে তাকে এবং পরে একে একে পরিবারের বাকি তিন সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তারা। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এ দাবি করেন। তিনি জানান, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দুজনই আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে একই ধরনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ময়নাতদন্তেও চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার। একই সঙ্গে নিহত প্রীতিলতা ও আগামীর ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির অংশবিশেষ পড়ে শোনান। সেখানে সিদ্ধার্থ বলেন, ‘ইয়াবা আগে মাঝেমধ্যে উৎসব হলে খাইতাম। গত এক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার একটা করে ইয়াবা খাই। ২১ আগস্ট (শুক্রবার) ভোরের সময়। সম্প্রতি আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর প্রাইভেসির জন্য সে বিজয় কাকুর বাসায় ছয়-সাত মাস ধরে ঘুমায়। খাওয়া-দাওয়া করে বাসায় থাকে, বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমায়। গত এক মাস ধরে বৃহস্পতিবার সীমান্তদের বাসায় থাকে। সীমান্ত নেশা করে না। ঘটনার বিষয়েও কিছু জানে না।’ পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে করে সীমান্তের বাসায় যান সিদ্ধার্থ। সেখানে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন তারা। রাত ৩টার দিকে আবার ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে কামাল কাছনার ইয়াবা কারবারি শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও চারটি ইয়াবা নেন। ওই ইয়াবার জন্য নিজের মোবাইল ফোন বন্ধক রাখেন সিদ্ধার্থ। এরপর আবার সীমান্তের বাসায় ফিরে যান তারা। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় কুকুর দেখতে পেয়ে প্রাচীর টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে ঢোকেন। ওই বাড়ির ছাদ হয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পৌঁছান। পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতির বাড়ির ছাদ চারদিকে হাফ-ওয়াল দিয়ে ঘেরা থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে আবার ইয়াবা সেবন করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তারা বুঝতে পারেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। ওই রাতে মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন তারা। এর আগে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবনের অভিজ্ঞতা ছিল বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সিদ্ধার্থ। সকালে ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন গণপতি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ পুলিশের দাবি, এরপর নিজেদের ‘মান-সম্মান’ বাঁচাতে গণপতির গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। পরে তার মরদেহ ছাদের এক পাশে রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেন। শব্দ শুনে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী ছাদে এলে তারা চিৎকার শুরু করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ গামছা দিয়ে প্রীতিলতার গলা চেপে ধরেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ এক হাতে আগামীর গলা এবং অন্য হাতে তার মুখ চেপে ধরেন। প্রীতিলতার মৃত্যুর পর একই গামছা দিয়ে দুজন মিলে আগামীর গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন। তাতে তার মৃত্যু না হলে ছাদে কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে তার গলায় পেঁচানো হয়। দুই দিক থেকে সেই রশি টেনে তাকে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর বাড়ির ভেতরে গিয়ে গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে ঘুম থেকে ওঠা অবস্থায় দেখতে পান তারা। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ এরপর তার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। চারজনকে হত্যার পর বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করেন দুই আসামি। পুলিশ জানিয়েছে, ছাদে পড়ে থাকা পুরোনো একটি প্লাস দিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার পাশাপাশি প্রীতিলতা ও আগামীর মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে সরিয়ে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়। এরপর ক্লান্ত হয়ে দুই আসামি গোসল করেন এবং সেখানে থাকা আরও একটি ইয়াবা সেবন করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করেন মুগ্ধ—এমন দাবি করে পুলিশ জানিয়েছে, এরপর ঘরের ড্রয়ার খুলে বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। মুগ্ধ ঘর থেকে স্বর্ণালঙ্কার এনে দিলে সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন। বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকাও নেন তারা। জুমার নামাজের সময় গণপতির বাড়ির ছাদ থেকে দেবুদের বাড়ির ছাদে গিয়ে দেয়াল টপকে বেরিয়ে যান দুজন। মুগ্ধ টাকা এবং সিদ্ধার্থ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যান। পরে সেগুলো গোপন করার চেষ্টা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে মুগ্ধর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেন সিদ্ধার্থ। সেই টাকা দিয়ে ইয়াবা কেনার সময় বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন তিনি। পুলিশ কমিশনার জানান, মুগ্ধ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও ঘটনার একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া গেছে। দুই আসামির ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। তদন্তে আরও কয়েকজনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এক প্রতিবেশী নারী হত্যাকাণ্ডের সময় আসামিদের চিৎকার শুনেছিলেন বলেও পুলিশকে জানিয়েছেন। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, ওই নারী পুলিশকে বিষয়টি জানানোর কারণে তার স্বামী তাকে মারধর করেন। প্রীতিলতা ও আগামীর মরদেহে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়ার বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া তথ্য নিয়েও কথা বলেন পুলিশ কমিশনার। তিনি জানান, দুই নারীর মরদেহ থেকে ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাতে ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি। তিনি আরও বলেন, গলায় শ্বাসরোধ বা ফাঁস লাগার ঘটনায় মরদেহ থেকে বীর্য ও মলমূত্র বের হয়ে আসতে পারে। এটি বাইরের বীর্য নয়, মরদেহের ভেতর থেকেই বের হয়। একইভাবে গলায় ফাঁস লাগলে চোখ কিছুটা বেরিয়ে আসার মতো শারীরিক পরিবর্তনও ঘটতে পারে বলে জানান তিনি। সীমান্ত দাস ও বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। বক্তব্য শেষ করার পর দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দিলেও হত্যার উদ্দেশ্য ও তদন্তসংক্রান্ত অন্য প্রশ্নগুলোর ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি দ্রুত সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন।