দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী পদ্মা সেতুর চার বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২২ সালের ২৬ জুন সেতুটি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচল শুরু হয়। গত চার বছরে সেতুটি ব্যবহার করেছে আড়াই কোটিরও বেশি যানবাহন এবং এ সময় টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা সরকার ঋণ হিসেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে প্রদান করে। বর্তমানে সেতুর ওপরের অংশ দিয়ে সড়ক যানবাহন চলাচল করছে এবং নিচতলা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে রেল যোগাযোগ। সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ জানিয়েছেন, টোল আদায়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ভালো অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর মতে, পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমানো এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করা হয় এবং পরদিন থেকে যান চলাচল শুরু হয়। পরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে সেতুর ওপর দিয়ে রেল চলাচল চালু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি এসেছে। চার বছরে টোল আদায়ের চিত্র সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০২২ সালে পদ্মা সেতু ব্যবহার করে প্রায় ২৭ লাখ ৯০ হাজার যানবাহন। সে বছর টোল আদায় হয় প্রায় ৪০৩ কোটি টাকা। পরবর্তী বছরগুলোতে টোল আদায়ের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে— ২০২৩ সালে: ৮১৪ কোটি টাকার বেশি ২০২৪ সালে: ৮৩৬ কোটি টাকার বেশি ২০২৫ সালে: ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি ২০২৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত: ৪৪৯ কোটি টাকার বেশি সব মিলিয়ে চার বছরে মোট টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকারও বেশি। যানবাহন চলাচলের দিক থেকে ২০২৫ সাল ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত বছর। ওই বছরে ৭২ লাখের বেশি যানবাহন পদ্মা সেতু ব্যবহার করে। ঈদে গড়েছে নতুন রেকর্ড সাম্প্রতিক ঈদুল আজহা উপলক্ষে এক দিনে সর্বোচ্চ যানবাহন পারাপারের রেকর্ড গড়ে পদ্মা সেতু। গত ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করে। ওই দিন টোল আদায় হয় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বেশি। পরদিন আরও ৪০ হাজারের বেশি যানবাহন সেতু পার হয় এবং প্রায় ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা টোল আদায় হয়। জনপ্রিয় হচ্ছে ই-টোল ব্যবস্থা পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহ বা ই-টোল ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় বর্তমানে ১২ হাজারের বেশি যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ই-টোল ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৮ কোটির বেশি টাকা আদায় হয়েছে। নিবন্ধিত যানবাহন নির্ধারিত লেনে প্রবেশ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল কেটে নেওয়া হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি যানজট কমানো, সময় সাশ্রয় এবং টোল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তিবিদ আবদুল্লাহ আল ফাহিম বলেন, ই-টোল ব্যবস্থার ফলে যানবাহনের অপেক্ষার সময় কমেছে, কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হচ্ছে এবং সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি টোল আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।