প্রকাশ : ... | ... | ...

৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট আজ, লড়াইয়ে মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদ


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোট দিতে যাচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদকক্ষে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি বেছে নেবেন তারা। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপি মনোনীত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ। নির্বাচনে ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল ঘোষণা না হওয়ায় মোট সংখ্যার তুলনায় ভোটার একজন কম। ২০৯ জন সংসদ সদস্য নিয়ে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন রয়েছে বিএনপির। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য দলের বিপরীতে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। ফলে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব এবং সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। সংসদ সদস্য হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি নিজেও ভোট দেবেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য প্রথমে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী না দেওয়ার কথা বললেও পরে তাকে প্রার্থী করে। সংসদ সদস্য না হওয়ায় অলি আহমদ নিজে ভোট দিতে পারবেন না। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা অলি আহমদ একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বিএনপি ছেড়ে পৃথক দল গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীর বিক্রম খেতাব পাওয়া এই মুক্তিযোদ্ধা সবশেষ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেন। যেভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকায় নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের পৃথক বৈঠক ডাকা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সেই বৈঠকে সভাপতিত্ব করার পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনা করবেন। সাধারণ নির্বাচনের মতো এ ভোট গোপন ব্যালটে হবে না। প্রত্যেক সংসদ সদস্য ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর পাশে নিজের সম্পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। নিজ নিজ আসনে বসেই তারা ভোট দেবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণ শুরুর পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভোট দেওয়ার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে। অন্য সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সময় সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। ভোট গ্রহণ শেষ হলে গণনার পুরো প্রক্রিয়া আবার সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সংসদকক্ষেই ফল ঘোষণা হবে এবং পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। সংসদের চিফ হুইপ জানিয়েছেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার পর সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর আরও আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নে একজন করে প্রার্থী থাকায় ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। এর আগে ১৯৭৫ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় গিয়েছিল দেশ। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যসহ ভোটার ছিলেন ৩৩০ জন। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছিলেন ২৬৪ জন এবং ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন ৬৬ জন সংসদ সদস্য। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত ১৮ জন ব্যক্তি ২২ মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মেয়াদের রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি অস্থায়ী ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিও রয়েছেন। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর পর থেকে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে, আর রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ—এই দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্যান্য দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভেঙে দেওয়া; সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি; জরুরি অবস্থা ঘোষণা; রাষ্ট্রদূত নিয়োগ; যুদ্ধ ঘোষণা; শান্তি চুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো বিষয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না, সে বিষয়েও আদালত প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা অথবা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিকেই সাধারণত রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। ফলে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিক এবং নির্ধারিত সীমার মধ্যে পরিচালিত হয়। তবে রাষ্ট্রীয় সংকট বা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিক সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রপতিকে একক বা স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা গেছে।