| ছবি: সংগৃহীত
সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্রে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মূল্যায়ন করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির আশঙ্কার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। সোমবার (২৪ আগস্ট) সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। সিপিডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানেও বড় ধাক্কা এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতেও বড় পতন হয়েছে বলে সিপিডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে। একইভাবে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। রাজস্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিপিডি জানায়, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। সিপিডির সম্ভাব্য হিসাবে, রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। আরও বড় পতন হয়েছে মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিতে। এটি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক সহায়তা ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতিতে আগে থেকেই বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা ছিল। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। ফলে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল অবস্থায় থাকার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক কেমন ছিল, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল না থাকাকে সরকারের বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন তিনি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার বারবার খারাপ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার কথা বললেও সেই পরিস্থিতির একটি সমন্বিত দলিল তৈরি করেনি। ফলে সরকারের বর্তমান বক্তব্য ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সমন্বয় করে অগ্রগতি মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন সরকারের কাছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা—এই দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে বলে তার মূল্যায়ন। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমেও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি দেখছে সিপিডি। নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, তার অনেকগুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলে উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। সরকারের প্রতিশ্রুতি ও নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ পর্যবেক্ষণে সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা তৈরি করেছে। নয়টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে এসব পদক্ষেপ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ড. দেবপ্রিয়র মতে, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় ঘটেছে। মিডিয়া সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন।