প্রকাশ : ... | ... | ...

নেপালের ভয়াবহ বন্যার উৎস ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস: ইউএসজিএস


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: প্রতীকী ছবি

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বিপর্যয়ের আগে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হওয়ায় শুরুতে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। হিমবাহ ধস ও বিপুল ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল। বুধবার সকাল ৯টার দিকে তিব্বতের দিক থেকে ভোতে কোশি নদীতে প্রবল ঢল নেমে আসে। এতে নেপালের রাসুয়া, ধাদিং ও নুয়াকোট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন কাদা-পানিতে ডুবে যায় অথবা ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত ও মৃতদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। দিনভর হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গত এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্যোগে পর্যটকদের বড় একটি অংশেরও খোঁজ মিলছে না। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বন্যার কয়েক ঘণ্টা পর অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয়। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে জড়ো হয়েছেন। ওই কেন্দ্র থেকেই হেলিকপ্টারে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দুর্যোগে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির সময় পুলিশকে মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করতে হচ্ছে। নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের অংশেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গিয়রং এলাকায় তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিহতের সংখ্যা যাচাইয়ের পাশাপাশি সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছে। তিব্বতের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে বিপর্যয়ের ভয়াবহতাও ধরা পড়েছে। সেখানে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দৌড়াতে দেখা যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাথর, কাদা ও পানির বিশাল ঢল ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বিপর্যয়ের উৎস সম্পর্কে বুধবার সন্ধ্যায় বিস্তারিত তথ্য দেয় ইউএসজিএস। সংস্থাটি জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে কাঠমান্ডুর উত্তরে একটি কম্পন প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেটি ভূমিকম্প ছিল না; হিমবাহ ধস এবং এর সঙ্গে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই কম্পন তৈরি হয়েছিল। ধসটি পরে ভূমিকম্পের সমতুল্য ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়। ইউএসজিএস স্পষ্ট করেছে, ওই সময়ে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক বিশ্লেষণেও। সেখানে নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুয়াগাধি সীমান্তপথ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধসের চিহ্ন দেখা যায়। ওই ধসের ফলে লেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানির ঢল তৈরি হয়। লেন্দে খোলা চীন থেকে নেপালে প্রবাহিত ভোতে কোশি নদীর একটি উপনদী। শক্তিশালী ওই ধসের কারণেই আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে সেই ঢল নিম্নাঞ্চলে নেমে এসে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটায়। একই অঞ্চল গত বছরও আকস্মিক বন্যার মুখে পড়েছিল। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে পড়ে সে বন্যা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ওই ঘটনায় নয়জন নিহত হন। নেপাল ও চীনের মধ্যে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবারের বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণ এবং ইউএসজিএসের পর্যবেক্ষণ একই দিকে ইঙ্গিত করছে—বন্যার আগে অনুভূত কম্পনের উৎস ভূমিকম্প নয়; হিমবাহ এবং বরফ-পাথরের বড় ধরনের ধসই ছিল বিপর্যয়ের মূল কারণ।