| ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে নতুন করে পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে কানাডা। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম থেকে শুরু করে পনির, পোশাক ও কৃষি সরঞ্জাম—বিভিন্ন পণ্যে ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে এ শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে। একই দিনে কানাডার কয়েক শ্রেণির পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। ফলে দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর বাণিজ্যিক বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মঙ্গলবার কানাডা পাল্টা শুল্কের পদক্ষেপ নেওয়ার দিনই হোয়াইট হাউস জানায়, আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কানাডার কিছু দুগ্ধপণ্য, অধিকাংশ মদ্যপ পানীয় এবং নির্দিষ্ট মোটরসাইকেল ও মোপেড যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বিভিন্ন ধরনের কানাডীয় মদ ও মদ্যপ পানীয়ের পাশাপাশি কিছু মোটরসাইকেল, মোপেড, ঘোলের গুঁড়াসহ দুগ্ধজাত পণ্য এবং কয়েক ধরনের মোলাসেস রয়েছে। কানাডার পাল্টা শুল্কের আওতায় রয়েছে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, পনির, গৃহস্থালি সামগ্রী, পোশাক, প্রসাধনী ও কৃষি সরঞ্জামসহ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য। গত মাসে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়ছিল। এর আগে ২২ আগস্ট কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৫ শতাংশ পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধ, মদ্যপ পানীয় ও গাড়ি শিল্পের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করছে। এবার পণ্যবাণিজ্যের বাইরে সরকারি ক্রয়েও কানাডার ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন পণ্যের জন্য কানাডা ‘পূর্ণ ও ন্যায্য সমতা’ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয়চুক্তিতে কানাডীয় পণ্যকে অযোগ্য ঘোষণার জন্য জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর কথা বলছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কানাডার অর্থনীতিকে আরও স্বাধীন ও বহুমুখী করাই এখন সরকারের লক্ষ্য, যাতে কোনো দেশ কানাডাকে জিম্মি করতে না পারে এবং দেশটি নিজের মতো করে চলতে পারে। মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের লক্ষ্য সংঘাত আরও বাড়ানো নয় বলেও জানিয়েছেন কার্নি। তার মতে, এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য কানাডীয় শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজে বের করার উদ্যোগও জোরদার করছে তার সরকার। কানাডার জন্য এ কাজ সহজ নয়। বর্তমানে দেশটির মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেই নির্ভরতা কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে অটোয়া। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক টানাপোড়েনে স্বল্পমেয়াদে কানাডা কিছু ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার সুযোগও তৈরি হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যবিরোধ অবশ্য নতুন নয়। কানাডার সুরক্ষিত দুগ্ধবাজার এবং দেশটির কাঠ উৎপাদনকারীদের দেওয়া ভর্তুকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি দীর্ঘদিনের। তা সত্ত্বেও দুই দেশ বহু বছর ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেই সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কানাডীয় পণ্যে শুল্ক আরোপের পাশাপাশি তিনি একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। এসব মন্তব্য কানাডায় ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য আলোচনা আবার কবে শুরু হবে, তা স্পষ্ট নয়। কোনো পক্ষই দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফেরার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে পাল্টাপাল্টি শুল্ক ও আমদানি নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যসংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।