প্রকাশ : ... | ... | ...

মেট্রোরেলে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ, শত শত বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি শনাক্ত


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলকারী এমআরটি লাইন-৬-এ একাধিক কাঠামোগত ও পরিচালনগত ত্রুটির তথ্য উঠে এসেছে স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেয়ারিং প্যাড, পিয়ার হেড, বক্স গার্ডার, ট্র্যাক ও ট্রেন পরিচালনায় বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা একসঙ্গে মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থায় একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে, যা যাত্রী নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। অডিটে দেখা গেছে, মেট্রোরেলের মোট বেয়ারিং প্যাডের ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ। পাশাপাশি ৪৬টি পিয়ার হেড ও অন্তত ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটল শনাক্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিট খসে পড়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে। মেট্রোরেলের উড়ালপথে বেয়ারিং প্যাড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, যা ট্রেনের ওজন ও কম্পন পিলারে স্থানান্তর করে। পরিদর্শনে ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে ট্রেন চলাচলের সময় বেয়ারিং প্যাডে অস্বাভাবিক আঘাতের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ৪২৩ নম্বর পিয়ারে একটি বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ত্রুটিগুলোর কারণ হিসেবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, নির্মাণ ত্রুটি কিংবা নকশাগত দুর্বলতা—সবকিছুই সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো প্রতিস্থাপনের কোনো পূর্ণাঙ্গ উদ্যোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গত বছরের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট এলাকায় একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে পথচারীর মৃত্যুর পর হাইকোর্ট ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) নয় সদস্যের একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটি গঠন করে। চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বাধীন কমিটি চলতি বছরের মে মাসে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ফাটল ও কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ অডিটে ৪৬টি পিয়ার হেড এবং ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটলের তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে ৩৪১ নম্বর পিয়ারের ফাটল নিরাপদ সীমার চেয়ে বড় হওয়ায় সেটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ফাটলের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ক্র্যাক গেজ স্থাপন কিংবা অনুমোদিত প্রকৌশল পদ্ধতিতে মেরামতের কোনো কার্যকর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমন অবহেলা ভবিষ্যতে কাঠামোগত ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গতি কমিয়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ট্র্যাকের ত্রুটি, অস্বাভাবিক কম্পন এবং বেয়ারিং প্যাডের সমস্যার কারণে বর্তমানে মেট্রোরেলের ১০টি অংশে অস্থায়ী গতিসীমা (টেম্পোরারি স্পিড রেস্ট্রিকশন) কার্যকর রয়েছে। যেখানে মূল নকশা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হওয়ার কথা, সেখানে এসব অংশে ট্রেন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। কিছু এলাকায় প্রকৃত গতি আরও কমে ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটারে নেমে আসছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূল ত্রুটি দূর না করে শুধু গতি সীমিত রেখে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়। পরিচালনাগত ত্রুটিও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি অডিটে ট্রেনের 'আন্ডারশুটিং' সমস্যাকে অন্যতম বড় পরিচালনাগত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্বাভাবিক ব্রেকিংয়ের কারণে অনেক সময় ট্রেন নির্ধারিত স্টপিং পয়েন্টের আগেই থেমে যাচ্ছে। এতে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অমিল তৈরি হচ্ছে, যা যাত্রীদের পড়ে যাওয়া বা আটকে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেনসেট রাজস্বভিত্তিক পরিচালনা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া ট্রেনের চাকার অতিরিক্ত ক্ষয়, সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে ধারাবাহিক বৈদ্যুতিক স্পার্কিংকেও উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। দীর্ঘদিনের সমস্যা, নেই আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিপো এলাকায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্র্যাক বসে যাওয়ার সমস্যা বিদ্যমান। নিয়মিত মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধান এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে কমিটি উল্লেখ করেছে, পুরো মেট্রোরেল ব্যবস্থায় এখনো কোনো কার্যকর রিয়াল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং (এসএইচএম) ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে পিলারের ফাটল, বেয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি, ট্র্যাকের বসে যাওয়া বা অস্বাভাবিক কম্পনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করার সুযোগ নেই। স্থায়ী সমাধানের সুপারিশ অডিট কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে বেয়ারিং প্যাডে ব্র্যাকেট সংযোজন, ট্রেনের গতি কমিয়ে পরিচালনা কিংবা অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণের মতো পদক্ষেপগুলো কেবল সাময়িক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। এগুলোকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। কমিটি জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকির বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, ফাটল পর্যবেক্ষণে ক্র্যাক গেজ স্থাপন, পূর্ণাঙ্গ ডাইনামিক ভাইব্রেশন পরীক্ষা, ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি স্মার্ট স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল ত্রুটি ব্যবস্থাপনা এবং একটি স্বাধীন সেফটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছে অডিট কমিটি।